জেলা পর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে বিপাকে পড়েছে আওয়ামী লীগ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা দলের দুঃসময়ের কর্মী এবং ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দিয়েছেন কেন্দ্রে।

আবার অনেক জেলাগুলোতে দেখা গেছে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের মতের অমিল থাকায় এক জেলায় ২টি কমিটি জমা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে প্রস্তাবিত কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে ছাত্রদল, শিবির, যুবদল এমনকি ফ্রীডম পার্টির নেতাদের। এতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে কারণে কমিটিগুলো বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের পুনরায় যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনে নতুন করে কমিটি করতে বলেছেন। দলীয় সভানেত্রীর নির্দেশনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এখন জেলা নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। নানাভাবে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই-বাছাই করছেন। অসংগতি থাকলে তা দূর করার তাগিদ দিচ্ছেন।


আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে তার দলীয় নেতাদের সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যেন জেলা কমিটিতে দুর্নীতিবাজ, সুযোগ সন্ধানী এবং হাইব্রিড নেতাদের অন্তর্ভুক্ত না করা হয়।

দেশের ৮টি বিভাগের জন্য ৮টি টিম গঠন করে দিয়েছেন দলটি। যে সকল ত্যাগী নেতারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যোগ্য থাকার পরেও মনোনয়ন পায়নি, আবার সতন্ত্র ভাবে নির্বাচন করে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেনি। সে সকল নেতা কর্মীদের উপজেলা কমিটিতে পদ থাকবে বলে আশা থাকলেও দেখা গেছে তাদের প্রস্তাবিত কমিটিতে নাম আসেনি। এ নিয়ে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এসব নানা অভিযোগের কারনে ধাপে ধাপে জেলা গুলোতে কমিটি প্রদানের সময় পিছিয়ে যাচ্ছে। 

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, বিভিন্ন জেলা থেকে আওয়ামী লীগের কমিটিগুলো জমা দেওয়া হয়েছে। সেগুলো যাচাই বাছাই শেষে আমরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করবো। যারা দলের দুর্দিনে আমাদের দলের জন্য কাজ করেছে তারাই কমিটিতে স্থান পাবে। কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হবে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে আওয়ামী লীগের এ নেতা জানান, এখনও যাচাই বাছাই চলছে যাতে যোগ্য ব্যক্তিরা বঞ্চিত না হয়। তবে অক্টোবরের মধ্যেই আমরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করতে পারবো বলে আশা করছি। 


আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা সঠিক ভাবে কাজ করছেন। কমিটি গুলো নিয়ে কিছু অভিযোগ জমা পরেছে। এই অভিযোগ গুলো যাচাই বাছাই করে তার পরেই কমিটি দেওয়া হবে। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুসারে, দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের সাথে পরামর্শের পরে এই পূর্ণাঙ্গ কমিটিগুলি অনুমোদন দেবেন।

আপাতত অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রে জমা পড়া ৩১ জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। এ নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। নানা মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কমিটিতে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

দলীয় সূত্র জানায়, গত বছর কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সম্মেলনের আগে তড়িঘড়ি করে ২৯টি জেলার সম্মেলন করা হয়। চলতি বছরে সম্মেলন হয় মাত্র দুটি জেলার। এর মধ্যে গত বছর ফেনী জেলা ২৬ অক্টোবর, নোয়াখালী ২০ নভেম্বর, খাগড়াছড়ি ২৪ নভেম্বর, বান্দরবান ২৫ নভেম্বর, রংপুর জেলা ও মহানগর ২৬ নভেম্বর, যশোর জেলা ২৭ নভেম্বর, কুষ্টিয়া জেলা ২৮ নভেম্বর, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ৩০ নভেম্বর, পটুয়াখালী ২ ডিসেম্বর, নড়াইল ২ ডিসেম্বর, সিলেট জেলা ও মহানগর ৫ ডিসেম্বর, নীলফামারী জেলা ৫ ডিসেম্বর, ঠাকুরগাঁও জেলা ৬ ডিসেম্বর, বগুড়া জেলা ৭ ডিসেম্বর, চট্টগ্রাম জেলা উত্তর ৭ ডিসেম্বর, বরিশাল মহানগর ৮ ডিসেম্বর, রাজশাহী জেলা ৮ ডিসেম্বর, বাগেরহাট জেলা ৯ ডিসেম্বর, কুমিল্লা উত্তর জেলা ৯ ডিসেম্বর, খুলনা জেলা ও মহানগর ১০ ডিসেম্বর, হবিগঞ্জ জেলা ১১ ডিসেম্বর, লালমনিরহাট জেলা ১১ ডিসেম্বর, সাতক্ষীরা ১২ ডিসেম্বর, কুড়িগ্রাম ১২ ডিসেম্বর, ঝালকাঠি জেলা ১২ ডিসেম্বর। চলতি বছরের ১ মার্চ রাজশাহী মহানগর, ৫ মার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন করা হয়। এসব জেলা সম্মেলনে কোথাও সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক কিংবা সঙ্গে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বা সাংগঠনিক সম্পাদক অথবা সদস্য পদেরও নাম ঘোষণা করা হয়। অধিকাংশ জেলায়ই দুই নেতা, কোথাও এক নেতা, কোথাও বা তিন নেতায় চলছে। প্রায় এক বছর পর জেলাগুলো পূর্ণাঙ্গ কমিটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রে জমা দেয়। দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে কারণে কমিটিগুলো বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের পুনরায় যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনে নতুন করে কমিটি করতে বলেছেন। দলীয় সভানেত্রীর নির্দেশনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এখন জেলা নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। নানাভাবে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই-বাছাই করছেন। অসংগতি থাকলে তা দূর করার তাগিদ দিচ্ছেন। 

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘দলের দুঃসময়ের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করতে হবে। হঠাৎ করে কেউ দলে এলে তাকে প্রথমেই নেতা বানানো যাবে না। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে কোনো অবস্থাতেই অনুপ্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে না।’